তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৬ মার্চ ২০১৯

ফিচার

বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারে ফিরবে পাটের সোনালী অতীত

রীনা পারভীন

জাতীয় পাট দিবস-২০১৯ এর মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারেই সমৃদ্ধি”। এ প্রতিপাদ্যকে সমানে রেখে বাংলাদেশের বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে এবং সম্ভাবনা তুলে ধরতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে পাটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। পাটসমৃদ্ধ বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সামনে বহুমুখী পাটপণ্যের সম্ভার সাজিয়ে তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে পেরেছে।

বাংলাদেশের পাটখাতের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন এবং এর ব্যবহার। পাটপণ্যের পাশাপশি হরেকরকম বাহারি, নিত্যব্যবহার্য, ফ্যাশনেব&ল্ বহুমুখী পাটসামগ্রীর প্রসার ও বিপণন এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৯১.৯৯ লক্ষ বেল কাঁচা পাট উৎপন্ন হয়েছে। কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ১৩.৭৯ লক্ষ মে. টন। পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এখাতে রপ্তানি আয় ১২৯৪.৬৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের উৎপাদিত প্রচলিত পাটপণ্যের পাশাপাশি সোনালী আঁশের তৈরি বহুমুখী পাটপণ্য নতুন মাত্রায় এদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

২০০২ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে এ দেশে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালে মাত্র ২১টি বহুমুখী পাটপণ্য নিয়ে স্থানীয় বাজারে আত্মপ্রকাশ করে জেডিপিসি’র ১০ জন উদ্যোক্তা। প্রাথমিক পর্যায়ে গুটিকয়েক বাহারি পাটের ব্যাগই ছিল সম্বল। নান্দনিক সৌন্দর্য ও ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কারণে এসব ব্যাগ বিশেষ করে মহিলাদের ফ্যাশনেব্‌ল্ ব্যাগ, জুতা ও জুয়েলারি বক্স ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করলেও সিনথেটিক পণ্যসামগ্রীর দাপটে অর্থাৎ এসব পণ্যের সুলভ মূল্য, সহজলভ্যতা এবং সৌন্দর্যের কারণে প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি পণ্যসামগ্রীর অভ্যন্তরীণ বাজার প্রসারিত হবার সুযোগ ছিল না।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রাকৃতিক তন্তুর প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি, সিনথেটিকের পরিবর্তে প্রাকৃতিক তন্তুর পণ্যসামগ্রী ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাটের বহুমুখী ব্যবহারের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে আশার আলো দেখায়। এভাবেই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলার পাট প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে জেডিপিসি’র নিবন্ধিত ৭০০ জন উদ্যোক্তা এখন ২৮০ ধরনের বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনের মাধ্যমে পাটখাতে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। তাদের উৎপাদিত বহুমুখী পাটপণ্যের স্থানীয় বাজার যেমন ব্যাপক তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে এদেশের বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বহুমুখী পাটপণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারের বিষয়ে আলোকপাত করলে দেখা যায় গত ৬/৭ বছর আগেও অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের তৈরি চালের বস্তা ও সুতলি ছাড়া তেমন কোনো বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার গড়ে ওঠেনি। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সৃষ্টি হয়েছে।

পাটপণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নান্দনিক বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, সেমিনার ফাইল এবং প্রমোশনাল পণ্যসমূহ, নানা ধরনের গৃহস্থালী, বাহারি সাজসজ্জায় ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী অন্যতম। উল্লেখ্য, গত ৫-৬ বছরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ-বিগ্রহের বিরুপ প্রভাবে প্রচলিত পাটপণ্যের ব্যবহার সংকুচিত ও স্থবির হলেও ধারাবাহিকভাবে বছরে ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে গতবছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার পণ্যসামগ্রী যেমন বিভিন্ন প্রকার ব্যাগ (ল্যাপটপ, স্কুল, লেডিস স্পোর্টস, ওয়াটারক্যারী, মোবাইল, পাসপোর্ট, ভ্যানিটি, শপিং, গ্রোসারি, সোল্ডার, ট্রাভেল, সুটকেস, ব্রিফকেস, হ্যান্ড ও মানি ব্যাগ), হোম টেক্সটাইল (বেড কভার, কুশন কভার, সোফা কভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোর ম্যাট, শতরঞ্জি), পরিধেয় বস্ত্র (ব্লেজার, ফতুয়া, কোটি, শাড়ী) ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় অফিস এক্সেসরিস হিসেবে ফাইল ফোল্ডার, পেনহোল্ডার, কার্ডহোল্ডার, টিস্যুবক্স, টেলিফোন ইনডেক্স, ডায়েরি, প্যাড, ভিজিটিংকার্ড ইত্যাদির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ দপ্তর/সংস্থায় অফিস ব্যবহার্য হিসেবে পাটের তৈরি পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সকলের জন্য একটা অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সরকারের অন্যান্য দপ্তর/সংস্থাও এ উদাহরণ অনুসরণ করতে শুরু করেছে।

সম্প্রতি বহুমুখী পাটপণ্যের জনপ্রিয়তা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর আগ্রহ ও চাহিদার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এসব দূতাবাসগুলো বাংলাদেশের জাতীয় দিবস পালনের প্রাক্কালে বিদেশি অতিথিদের বহুমুখী পাটপণ্যের উপহার সামগ্রী প্রদানে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। পাটের তৈরি মানিব্যাগ, টাই, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, ফুল, কুশন কভার, অফিস এক্সেসরিস যেন সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার! দূতাবাসসমূহের এ ধরনের উদ্যোগে সাড়া দিয়ে জেডিপিসি বহুমুখী পাটপণ্যের প্রসার, প্রচার ও ব্র্যান্ডিং এ দূতাবাসগুলোকে সহযোগিতা করে আসছে। ইতিমধ্যে জার্মানি, চীন ও ডেনমার্ক এ বাংলাদেশ দূতাবাসে এ ধরনের কর্নার স্থাপন করা হয়েছে যার মাধ্যমে বহুমুখী পাটপণ্যের সৌন্দর্য অবলোকন করাই নয় বরং আন্তর্জাতিক বাজারে এ দেশের বহুমুখী পণ্যের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরে পর্যটন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে নিবন্ধিত উদ্যোক্তাদের পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন ও বিক্রয়ের জন্য জেডিপিসি’র কার্যালয়ে একটি প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৮ সালে ও ২০১৯ সালের (ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৯৩ লক্ষ ১৬ হাজার ৯৬৫ টাকার পণ্য বিক্রয় হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য এ কেন্দ্রের পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ কেন্দ্রের প্রচার ও প্রসারের জন্য ৩৬০° সফটওয়ার তৈরি করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই সফটওয়ার চালু হলে কেন্দ্রটি ভার্চুয়ালি পরিদর্শনসহ প্রায় ২০০ ধরনের উৎপাদিত বহুমুখী পাটজাত পণ্য সারাবিশ্বের ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠান ৩৬০° এ্যাঙ্গেলে দেখার সুযোগ পাবেন, যা আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা পূরণে জেডিপিসি’র উদ্যোক্তারা কাজ করে গেলেও তাদের পেশাগত দক্ষতা ও সুপ্ত উদ্ভাবনী প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আর্থিক বরাদ্দ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য। জেডিপিসি’র নিজস্ব ডিজাইন ইন্সটিটিউট, R & D এবং কম্পোজিট মিল না থাকায় উদ্যোক্তাদের বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল (ফেব্রিক্স, ডাইং ও লেমিনেশন) প্রাপ্তিতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। উল্লেখ্য, বিশ্বে green product, green solution, green growth ইত্যাদি বিষয়ে অভাবনীয় সচেতনতা সৃষ্টির কারণে পলিথিন ব্যাগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে ৫৫টি দেশে, ৩১টি দেশে পলিথিন ব্যাগে কর আরোপ করা হয়েছে, ২৬টি দেশের কিছু স্টেটে আংশিক নিষিদ্ধ, ভল্টারি চার্জ প্রযোজ্য করা হয়েছে ৬টি দেশে এবং এশিয়ার ১২টি দেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২১ এর মাঝামাঝি নিষিদ্ধ কার্যকর হবে ২০টি দেশে।

বিশ্বের ৫৫টি দেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করায় পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার ব্যাপক হারে কমে গেছে। গবেষণায় আরো দেখা যায়, ২০০৮-২০১২ পর্যন্ত ইউরোপের ১৮টি দেশের মধ্যে ৬টি দেশে পাটের ব্যাগের চাহিদা বেড়েই চলেছে। এ ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে, দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলো এবং ফিলিপাইন ও আরব আমিরাতে পাটের ব্যাগের চাহিদা আকাশচুম্বী। তাই সারাবিশ্বে বহুমুখী পাটপণ্যের অপার সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার বিকল্প নেই।

এ দেশের বহুমুখী পাটপণ্যের প্রচার, প্রসার ও বিপণনের মাধ্যমে সারাবিশ্বে এর ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য জেডিপিসি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে । তাই দ্বিধাহীনভাবে বলা যেতে পারে যে, বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যেই লুকায়িত আছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনা! বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ও উন্নত দেশের তালিকায় উন্নীত করা এবং এসডিজি’র লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য।

#

০৫.০৩.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

ভূমি সেবার অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা

মো. রেজুয়ান খান

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও বিদ্যমান ভূমির পরিমাণ বিবেচনায় আধুনিক তথা সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকল্পে সরকার বদ্ধপরিকর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং গৃহহীনদের পুনর্বাসন এবং দেশব্যাপী ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করার মধ্যদিয়ে জনহিতকর কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁরই দেখানো পথ অনুসরণ করে ভূমি মন্ত্রণালয় সারাদেশে ভূমিহীন পরিবারের মাঝে কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গুচ্ছগ্রাম তৈরির মাধ্যমে ২০১৯ সালের মধ্যে সারাদেশে ৫০ হাজার গৃহহীন, ভূমিহীন ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য খাসজমিতে ঘর নির্মাণ করে তাদের পুনর্বাসন করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিগত দশ বছরে সরকার ৩১ হাজার ৩৫০টি গৃহহীন ও ছিন্নমূল পরিবারের লক্ষাধিক মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। চর ডেভেলপমেন্ট এন্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্প-৪ এর আওতায় জুন ২০১৮ পর্যন্ত নোয়াখালী জেলার হাতিয়া ও সুবর্ণচরের ১৪ হাজার খতিয়ান বিতরণের টার্গেটের মধ্যে ১২ হাজার ৪৬১টি পরিবারের মাঝে খতিয়ান বিতরণ করা হয়েছে।

কৃষি, অকৃষি, জলাভূমি, বনভূমি, পাহাড়, শিল্পাঞ্চলে ভাগ করে ল্যান্ড জোনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় ভূমি জোনিং প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মৌজা ও প্লটভিত্তিক ডিজিটাল ভূমি জোনিং কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য একটি নতুন প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন ও অনুমোদন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

জনগণ এখন সহজেই নামজারী, জমাভাগ, ভূমি উন্নয়ন কর, জমির নকশা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে পারছে। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ কার্যক্রম আধুনিকায়নের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সুবিধাভোগী জনগণের স্বল্প ব্যয়ে ও সময়ে ভূমি সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশের জমির খতিয়ান অনলাইনে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে উল্লিখিত অঞ্চলের মানুষ সহজেই নিজের জমির অবস্থান জানতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ, রেকর্ড প্রণয়ন এবং সংরক্ষণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়) কম্পিউটারাইজেশন অব এক্সজিস্টিং মৌজা ম্যাপস এন্ড খতিয়ান শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সিএস, এসএ ও আরএস জরিপের ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৩ হাজার ৪০৪টি খতিয়ানের ডাটা এন্ট্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবর ২০১৮ পর্যন্ত ৫৫টি জেলায় মোট ২ কোটি ৫৬ লাখ ৩১ হাজার ৪৭৭টি খতিয়ানের ডাটা এন্ট্রি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

সারাদেশে জীর্ণশীর্ণ ভূমি অফিসগুলোর আধুনিকায়ন অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজ চলছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ (৬ষ্ঠ পর্ব) প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ১৩৯টি উপজেলা ভূমি অফিস ও ৪৬৫টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সমগ্র দেশে শহর ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজারটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নির্মাণ কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬৫০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের টেণ্ডার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে যার মধ্যে ৫৭১টি ভূমি অফিস নির্মাণ কার্যক্রম চলমান আছে। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদানের নিমিত্তে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর কম্পাউন্ডে ভূমিভবন কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ চলমান আছে। ঢাকাস্থ ভূমি প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (৬ষ্ঠ তলা থেকে ১২তম তলা) ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ চলছে। এছাড়া ভূমি প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রকল্পের নির্মাণ কাজ দেশের ০৭টি বিভাগে চলমান রয়েছে। উপজেলা ভূমি সার্কেল অফিসের সহকারী কমিশনার কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজ সহজীকরণের জন্য পূর্বে এসিল্যান্ডদের নামে বরাদ্দকৃত মোটর সাইকেলের পরিবর্তে ২৮৮টি গাড়ি বিতরণ করা হয়েছে।

দুর্নীতিমুক্ত ভূমি সেবা নিশ্চিত করতে সারাদেশে অটোমেশন পদ্ধতির ব্যবহার প্রচলন হয়েছে। ভূমি সংস্কার বোর্ডের উদ্যোগে এ-টু-আই প্রকল্পের সহায়তায় ৩০১টি উপজেলায় ই-মিউটেশন ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং এ-টু-আই এর সহযোগিতায় ৫৪টি উপজেলা এবং ১৭,৯৫৪টি মৌজায় ১ কোটি ১ লাখ ৮ হাজার ৯০৯টি খতিয়ান অনলাইনে প্রদর্শন এবং জনগণকে সরবরাহ করার উপযোগী একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখে আসছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে সারাদেশে জমির অধিগ্রহণের কাজ অতি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে। পদ্মাসেতু প্রকল্প, পদ্মা রেল সেতু সংযোগ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও পটুয়াখালী জেলার পায়রাবন্দরের জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

  ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাজ আরও অধিকতর সহজীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি, বিধিমালার সংস্কার, সংশোধন ও প্রণয়ন করা হয়েছে। ২টি নীতি (জাতীয় ভূমি নীতি-২০১৮ এবং সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি-২০১৮) এবং ০৫টি আইন [বাংলাদেশ পরিত্যক্ত আইন (নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তি) আইন-২০১৮, ভূমি উন্নয়ন কর আইন-২০১৮, কৃষি জমি সুরক্ষা আইন-২০১৮, ভূমি জরিপ ও খতিয়ান পার্বত্য জেলা আইন-২০১৮ এবং হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন-২০১৮], ০১টি অধ্যাদেশ (পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাসমূহের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল রেগুলেশন-২০১৮), ০৪টি বিধিমালা (সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৮, পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বিধিমালা-২০১৮, হাট ও বাজার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৮ এবং স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল বিধিমালা-২০১৮) এবং ০১টি নীতিমালা (জাতীয় পুনর্বাসন নীতিমালা-২০১৮) উল্লেখযোগ্য।

বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’ বাস্তবায়ন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিসংশ্লিষ্ট সকল সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমি মন্ত্রণালয় ও এর আওতাভুক্ত দপ্তরসমূহের সকলেই নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।

#

০৫.০২.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক বনায়ন

মো. সাজেদুল ইসলাম

 

          গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার জানপাড়া গ্রামের বেগম রাবেয়া বন বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে এই বিভাগের মালিকানাধীন জায়গায় বন সৃজন করেন ২০০৪ সালে। বনের জায়গায় রোপণ করা গাছগুলির যাবতীয় পরিচর্যা করা এবং গরু-ছাগলের হাত থেকে গাছগুলোকে রক্ষা করতে তার পরিবার ও অন্যান্য উপকারভোগীদের সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে টহল প্রদান করা হয়। গাছ চুরি প্রতিরোধেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন তিনি। বাগানে টং বানিয়ে রাতে কেউ না কেউ গাছগুলোকে রক্ষা করতে থাকত। গাছের পরিচর্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণে বন বিভাগের লোকজন তাকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন।

 

            দীর্ঘ ১০ বছর গাছের পরিচর্যার পর লভ্যাংশের অংশ বাবদ ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা পায় সে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে পুনরায় এই বাগানের জায়গায় চারা রোপণ করে আরো সুন্দর বাগান গড়ে তুলবেন বলে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।

 

            অনেকেই বন বিভাগের মাধ্যমে পরিচালিত এই সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় আর্থিকভাবে উপকৃত হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন সমাজিক বনায়ন কর্মসূচি দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

 

            বন অধিদপ্তরের মতে, সামাজিক বনায়ন হলো স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত বনায়ন কার্যক্রম। ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামীণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করাই সামাজিক বনায়নের প্রধান লক্ষ্য। সামাজিক বনায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের স্বনির্ভর হতে সহায়তা করা এবং তাদের খাদ্য, পশুখাদ্য, জ্বালানি, আসবাবপত্র ও মূলধনের চাহিদা পূরণ করা।

 

            নার্সারি সৃজন, প্রান্তিক ও পতিত ভূমিতে বৃক্ষরোপণ করে বনজ সম্পদ সৃষ্টি, মরুময়তা রোধ, ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

            সামাজিক বনায়নের আওতায় সৃজিত বাগানের আবর্তকাল ন্যূনতম ১০ বছর। সৃজিত স্ট্রিপ বাগানে প্রতি কিলোমিটারে সাধারণত ৫জন এবং উডলট/ব্লক বাগান/ বাফারজোন/ এগ্রোফরেস্ট্রি/ উপকূলীয় চরভূমি ইত্যাদি বাগানে প্রতি একরে ১ জন হিসেবে উপকারভোগী সম্পৃক্ত করা হয়।

 

            অধিকাংশ উপকারভোগী সৃজিত উডলট ও কৃষি বন বাগানে অন্তর্বতীকালীন ফসল হিসেবে আদা, হলুদ, আনারস, গম, চীনাবাদাম, কচু, লেবু, সবজি এবং ঔষধি গাছপালা ও অন্যান্য ফসল রোপণ করে লাভবান হয়।

 

            অংশীদারিত্বমূলক লভ্যাংশ বণ্টন চুক্তিনামা অনুযায়ী সামাজিক বন থেকে প্রথম ৭ বছর পর্যন্ত প্রুনিং ও থিনিংকালে কর্তিত বৃক্ষ, ফলদবৃক্ষের ফল, উৎপাদিত কৃষি ফসল ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত সকল আয় সম্পূর্ণরূপ উপকারভোগীগণ পেয়ে থাকেন এবং আবর্তকাল শেষে বৃক্ষ কর্তনপূর্বক লভ্যাংশ উপকারভোগীদের মাঝে বণ্টন করা হয়।

 

            বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন গ্রামীণ জনপদে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সেই সাথে সামাজিক বনায়ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রশমন ও অভিযোজন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

            বন বিভাগ ১৯৬০ এর দশকে বন সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বপ্রথম বনায়ন কর্মসূচি বনাঞ্চলের বাইরে জনগণের কাছে নিয়ে যায়। এরপর ১৯৮১-৮২ সাল থেকে উত্তরবঙ্গের সরকারি বনভূমিতে বনায়নের জন্য বৃহত্তর ৭টি জেলায় কমিউনিটি ফরেস্ট্রি প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণে অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক বনায়নের প্রচলন করে।

 

            সরকার ২০০০ সালে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমকে ১৯২৭ সালের বন আইনে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আইনি কাঠামোতে নিয়ে আসে। সামাজিক বনায়নকে আরো শক্তিশালী করার জন্য ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা প্রবর্তন করে। আরো যুগোপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০১০ ও ২০১১ সালে এই বিধিমালায় সংশোধনী আনা হয়।

 

            বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক বনায়নের আওতায় ১৯৮১-৮২ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত ৮৪,৩৭৮ হেক্টর এবং ৬৮,৮৩০ কি.মি. বাগান সৃজন করা হয়েছে; সৃজিত বাগানে ৬,৫২,৯৫৫ জন উপকারভোগী সম্পৃক্ত রয়েছেন, যাদের মধ্যে মহিলা উপকারভোগীর সংখ্য ১,২১,৫০৭ জন; সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে সৃজিত বাগানসমূহ হতে ৩৪,৭৪৪ হেক্টর এবং ১৪৫৫৩ কি.মি. বাগান কর্তন করা হয়েছে যার বিক্রয়মূল্য ৯১৬ কোটি ২৬ লাখ ১৬ হাজার ৪২৬ টাকা; এ যাবৎ ১,৫১,৯১৫ জন উপকারভোগীর মাঝে ২৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬৮ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

 

 

-২-

 

            ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত পুনঃবনায়নের কাজে বৃক্ষরোপণ তহবিলে ৯১ কোটি ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩৬ টাকা পাওয়া যায় এবং এর মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকা পুনঃবনায়নের জন্য ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে। সামজিক বনায়নের মাধ্যমে সরকারের এ যাবৎ রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩৩১ কোটি ৮ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৬ টাকা।

 

            সামাজিক বনায়নে নার্সারিতে চারা উৎপাদন, পরিচর্যা, বাগান পরিচর্যা ইত্যাদি কার্যক্রমে মহিলাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদেরকে আত্মনির্ভশীল করা হয়ে থাকে। এছাড়া সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী ৩০ শতাংশ দুঃস্থ মহিলা উপকারভোগী হওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন।

 

            স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে গৃহীত সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মধ্যে অন্তত দুইজন মহিলা থাকবেন। বিধি ৭ এর (১) উপবিধিতে চুক্তির আওতায় উপকারভোগীর দায়িত্ব, কর্মব্যবস্থাপনা এবং সুবিধার ক্ষেত্রে স্ত্রী ও স্বামীকে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। সামাজিক বনায়নের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ মহিলাকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে। তাছাড়া, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুযায়ী মহিলাদের অগ্রাধিকার দিয়ে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে।

 

            সাধারণভাবে কোনো সামাজিক বনায়ন এলাকার এক বর্গ-কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী স্থানীয় অধিবাসীগণের মধ্য হতে উক্ত এলাকার উপকারভোগী নির্বাচিত হবেন। উপকারভোগী নির্বাচনের প্রাধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন ভূমিহীন; ৫০ শতাংশর কম ভূমির মালিক; দুঃস্থ মহিলা; অনগ্রসর জনগোষ্ঠী; দরিদ্র আদিবাসী; দরিদ্রফরেস্ট ভিলেজার এবং অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা অথবা মুক্তিযোদ্ধার অস্বচ্ছল সন্তান।

 

            কোনো সামাজিক বনায়ন এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক উপকারভোগী না পাওয়া গেলে উক্ত এলাকার নিকটতম এলাকায় বসবাসকারী অধিবাসীগণের মধ্য হতে উপকারভোগী নির্বাচন করা যাবে।

 

            সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০৪ (২০১৫ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যে-কোনো ভূমি যা সরকারি সম্পত্তি বা যার ওপর সরকারের অধিকার রয়েছে এবং সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বনায়ন সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনার জন্য মালিক স্বেচ্ছায় লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সরকারকে অর্পণ করা হয়েছে এমন যে-কোনো প্রকার ভূমিতে সরকার উপ-ধারা (২) এর আওতায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

 

            একটি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন সরকার সামাজিক বনায়নের জন্য এরূপ ভূমি ব্যবস্থাপনা কাজে সহায়তাকারী ব্যক্তিগণকে এক বা একাধিক লিখিত চুক্তিদ্বারা বনজদ্রব্যের অধিকার বা ভূমি ব্যবহারের অধিকার অর্পণ করে।

 

            বন অধিদপ্তরের মতে, সামাজিক বনায়নের উপযোগী কোনো ভূমিতে বনায়নে আগ্রহী স্থানীয় জনগোষ্ঠী বন বিভাগের বিট ও রেঞ্জ কার্যালয়ের মাধ্যমে অথবা সরাসরি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নিকট লিখিত আবেদন করিতে পারবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে গৃহীত সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটি উপকারভোগী নির্বাচন চূড়ান্ত করবেন।

 

            সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বন অধিদপ্তর বৃক্ষরোপণের কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন, সামাজিক বন সৃষ্টি ও এর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে উপকারভোগীদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করবেন।

 

#

০৫.০২.২০১৯                                                                                                                                                              পিআইডি প্রবন্ধ

 

 

 

কমিউনিটি ক্লিনিক : ঘরের দুয়ারে স্বাস্থ্যসেবা

মোহাম্মদ ফয়সুল আলম

 

            তৃণমূল মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রকল্প এখন স্বাস্থ্যসেবায় মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা ও শিশুর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে এ প্রকল্প। এসব ক্লিনিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিক এখন সাধারণ মানুষের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে। এক কথায় বলা যায় কমিউনিটি ক্লিনিক হচ্ছে সরকারের সর্বনিম্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো।

 

            সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থানায় কুসম্বি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা আশরাফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিন যাবত হাঁপানি ও শ্বাস কষ্টে ভুগছি। আমার পক্ষে ১৪ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বাড়ির কাছে, কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে এসেছি। এখানে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বিনামূল্যে ঔষধপত্র পাই আমরা।

 

            কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা গ্রহণকারী কেয়া সরকার বলেন, এই ক্লিনিকে অনেক ধরনের চিকিৎসা হয়। ঔষধ কিনতে হয় না। বিনামূল্যে ঔষধ দেওয়া হয়। আগে শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হতো। সময় লাগতো বেশি, টাকাও খরচ হতো। কিন্তু এখন আর শহরে যেতে হয় না। উপরের দুটি ঘটনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এখন সাধারণ রোগের চিকিৎসা তারা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকেই পাচ্ছেন।

 

            জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসা সেবাকে মানুষের দৌড়গোঁড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত মেয়াদে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করেন এবং সে সময় ১০ হাজার ৭২৩টি ক্লিনিক চালু করা হয়। এর ফলে ঐ সময়কালে চিকিৎসা সেবা দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। কিন্তু ২০০১ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দেশের দরিদ্র মানুষ আবারো চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করে।

 

            ২০০৯ সালে পুনরায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩ হাজার ৭০৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। আরো এক হাজার ২৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মসূচির আওতায় আসছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকে ভিজিটের সংখ্যা ৭৪ কোটির অধিক। এর মধ্যে ২ কোটির অধিক সংখ্যক জটিল রোগীকে উচ্চতর পর্যায়ে রেফার করা হয়। সরকারের এই মহতী উদ্যোগে দেশের অসহায় দুস্থ মানুষ সহজে ও বিনাপয়সায় হাতের নাগালে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে।

 

            সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচর্যার আওতায় অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রসবপূর্ব (প্রতিষেধক টিকাদানসহ) এবং প্রসবপরবর্তী (নবজাতকের সেবাসহ) সেবা প্রদানকারী কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সময়মতো যক্ষ্মা রোগের প্রতিষেধক টিকাদান, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিও, ধনুষ্টংকার, হাম, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, কুষ্ঠ, কালা-জ্বর, ডায়রিয়াসহ, অন্যান্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সেগুলোর সীমিত চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করছে। এছাড়া জ্বর, ব্যথা, কাটা/পোড়া, হাঁপানি, চর্মরোগ, ক্রিমি এবং চোখ, দাঁত ও কানের সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসাও প্রদান করা হচ্ছে। ক্লিনিকগুলোতে অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণসহ বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। বছরে প্রায় ২০০ কোটির অধিক ঔষধ এই ক্লিনিকের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে।

 

            ক্লিনিকগুলো বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় এবং সেখানে বিনামূল্যে সাধারণ রোগের ওষুধ পাওয়া যায় বলে দিন দিন এর সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও বাড়ছে। সরকারের পৃথক দুটি জরিপেও এসব ক্লিনিক নিয়ে ৮০ থেকে ৯৮ শতাংশ মানুষের সন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করা হয়। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) জরিপে দেখা গেছে, বাড়ির পাশের ক্লিনিক থেকে ওষুধ আর পরামর্শ পেয়ে ৮০ শতাংশ মানুষই সন্তুষ্ট।

 

            গ্রামীণ জনগণের অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সেবা বিতরণের প্রথম স্তর হলো কমিউনিটি ক্লিনিক। তৃণমূল

Feature weabsite.pdf Feature weabsite.pdf

Share with :

Facebook Facebook